রবিবার

৬ এপ্রিল, ২০২৫
২২ চৈত্র, ১৪৩১
৮ শাওয়াল, ১৪৪৬

মোদির প্রশংসায় পঞ্চমুখ বিএনপি,বিক্ষুব্ধ নেটিজেনরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৫ এপ্রিল, ২০২৫ ১৫:৫৪

শেয়ার

মোদির প্রশংসায় পঞ্চমুখ বিএনপি,বিক্ষুব্ধ নেটিজেনরা
মোদির প্রশংসায় পঞ্চমুখ বিএনপি।

শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কালজয়ী নেতৃত্বে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট নিয়ে যাত্রা শুরু করা বিএনপি দেশপ্রেমিক জনগণের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ভোগ করে আসছে। কিন্তু ৫ আগস্ট দিল্লির সেবাদাস দল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পতনের সাত মাস পর আজ ভারত ইস্যুতে মির্জা ফখরুল ও তার অনুসারীদের নেক্কারজনক ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। দলটির কিছু শীর্ষ নেতার হঠাৎ করে উগলেওঠা ভারতপ্রেম ও আওয়ামী লীগের ভারতীয় দাসত্বের বিকল্প হয়ে ওঠার প্রকাশ্য প্রচেষ্টা ব্যাপক ক্ষুব্ধ ও হতবাক করেছে দেশপ্রেমিক বাংলাদেশিদের।

ইদানীং প্রায় মির্জা ফখরুলকে ভারতের সুরে কথা বলতে শোনা যায়, ভারতকে খুশি রাখার নীতি মেনে চলতে দেখা যায়। দিল্লি হাসিনাকে পুনর্বাসনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নগ্নভাবে আগ্রাসন ও প্রোপাগাণ্ডা অব্যাহত রাখলেও এটা নিয়ে আর তেমন মাখা ঘামাতে দেখা যায় না তাদের। বিএনপির এসব নেতার ভাব এমন যে, হঠাৎ শত্রু ভারত বাংলাদেশের বন্ধুতে পরিণত হয়েছে। অথবা তাদের সাথে কোনো গোপন চুক্তি হয়েছে। যার কারণে চিরাচরিত চরিত্র বদলে ফেলেছেন তারা। যা ক্ষুব্ধ করেছে দিল্লির আগ্রাসন বিরোধী ছাত্রজনতা ও ২৪’এর অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিকে।

গত মাসের শেষ সপ্তাহে চীন সফরকালে ড. ইউনূস মন্তব্য করেছিলেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত সাতটি রাজ্য সম্পূর্ণরূপে ল্যান্ডলকড (স্থলবেষ্টিত)। সমুদ্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের কোনো উপায় নেই। আমরাই এই অঞ্চলের জন্য সমুদ্রের একমাত্র অভিভাবক। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে ভারতজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

ড. ইউনূসের ‘সেভেন সিস্টার্স’ মন্তব্যে ভারতের ত্রিপুরার রাজনৈতিক দল টিপরা মোথার প্রদ্যোৎ মাণিক্য আর আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা যেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষোগদারের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন। দুই নেতাই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। মাণিক্য নরেন্দ্র মোদীকে পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, দিল্লি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ স্থাপন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘শত শত কোটি টাকা খরচ’ না করে বরং বাংলাদেশের সেই অংশগুলো দখল করে নিক; যা ‘সব সময়ই ভারতের অংশ হতে চেয়েছে।’

গুরুতর এই ইস্যুতেও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কোনো প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি। সমালোচকরা বলছেন, তাদের এখনকার বক্তব্য-বিবৃতিতে কেবল দ্রুত নির্বাচন নিয়েই দাবি ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা জানাতে দেখা যায়। ভারতের অব্যাহত ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে বাংলাদেশকে ডিফেন্ড করতে তাদের কোনো প্রচেষ্টা আর চোখে পড়ে না। ‘নির্বাচন’ ‘নির্বাচন’ করতে করতে কিছু বিএনপি নেতা মুখের ফেনা তুলে ফেললেও ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাদের মুখ যেন তালাবদ্ধ। হঠাৎ করে ভারত ইস্যুতে যেন বোবা হয়ে গেছে তারা। সর্বশেষ মোদি-ইউনূস বৈঠকের দিনও সীমান্তে দুজন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে ভারত। তা নিয়েও কোনো প্রতিবাদ নেই দলটির।

অন্যদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে যেন একাই ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশকে কিভাবে সকল ক্ষেত্রে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে হয় তার প্রাণপন চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ভারতের কাছ থেকে সকল পাওয়া কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিতে বদ্ধপরিকর তিনি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব ক্ষেত্রে বিএনপি সহযোগিতা না করে উলটো নির্বাচনের জন্য চাপ সৃষ্টি করে ড. ইউনূসকে যেন ভারতীয় পরিকল্পনায় কোণঠোসা করে রাখতে বদ্ধপরিকর- এমন মন্তব্য করছেন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা।

সর্বশেষ বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে ব্যাংককে বাংলাদেশ ও ভারতের সরকার প্রধানের মধ্যকার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রথমবার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে গণহত্যাকারী হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা ছড়ানোর অভিযোগ তুলে তাকে থামাতে বলেন প্রধান উপদেষ্টা। সেই বৈঠক বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ, গঙ্গা ও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি, সীমান্ত হত্যা ও দুই দেশের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়েছে। মোদিকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, হাসিনা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে বিভিন্ন মাধ্যমে ‘বিদ্বেষমূলক মন্তব্য’ করে আসছেন, যেটা মনে হয় ভারতের ‘আতিথেয়তার লঙ্ঘন’। তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে ‘মিথ্যা ও বিদ্বেষমূলক অভিযোগ’ করে আসছেন।

প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সবগুলো বিষয় উত্থাপন করেন। কোনো ক্ষেত্রেই মোদিকে ছাড় দেননি তিনি। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের সংলঘুদের ওপর সাম্প্রদায়িতভাবে কোনো আঁচ না লাগলেও কথিত ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন’ ইস্যু ড. ইউনূসের কাছে উত্থাপন করেন মোদি। হিন্দুসহ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাগুলো তদন্ত করতে ড. ইউনূসের কাছে দাবি জানান। এবিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা সাফ জানিয়ে দেন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের খবরের ‘বেশিরভাগই ভুয়া’। সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ অনুসন্ধানে ভারতীয় সাংবাদিকদের তিনি আমন্ত্রণ জানান।

এদিকে, ড. ইউনূস-মোদির বৈঠকের আলোচনার বিষয়বস্তুগুলো ভালো করে না পড়েই হুট করে ভারতপ্রেম জাহির করেন বিএনপি মহাসচিব। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মোদি তোষণ করে তিনি বলেন, দুই দেশের জন্য ‘আশার আলো’ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, বিমসটেকে সাইডলাইন বৈঠক হয়েছে, এটা (বৈঠক) খুব আনন্দের কথা। আমরা মনে করি যে, ভূ-রাজনীতি এবং বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির যে প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশ-ভারতের এই অঞ্চলের যে প্রেক্ষাপট সেই প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ( মুহাম্মদ ইউনূস) এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি (নরেন্দ্র মোদী) সাহেবের বৈঠকটা আমাদের সামনে একটা আশার আলো তৈরি করছে।

মির্জা ফখরুলের এই মন্তব্যে ক্ষোভে ফেটে পড়েন নেটিজেনরা। সমালোচকরা বলছেন, ইদানিং কিছু বিএনপির নেতার উদ্দেশ্যই থাকে কথা-কথায় মোদিতোষণ করা, ভারত অখুশি হয় এমন কর্মকাণ্ড এগিয়ে চলা। যার কারণে কোনো ইস্যু ভালো করে না বুঝে অথবা হয়তো ভারতের সাথে গোপনে আঁতাত করে তারা ভারতপ্রীতি জাহির করছেন।

ফেসবুক ব্যবহারকারী আবু মুহাম্মদ মোদিতোষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়ে লিখেছেন, মির্জা ফখরুল ও বিএনপি যে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ইন্ডিয়ান দালালী করবে এটা তার এই বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট। তারা ক্ষমতায় আসার জন্য ইন্ডিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে জনগণের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই তাদের। তারা সরকার গঠন করলে পুনরায় ইন্ডিয়ান আধিপত্য বিস্তার হবে।

আলীস আহমেদ লিখেছেন, নৌকার মাঝি যদি বিবেক বুদ্ধিমান সহজে গন্তব্যস্থানে পৌঁছাইয়া দিতে পারে, তেমনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাতিকে সঠিক পথে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। হঠাৎ দেশবিদেশী ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ডক্টর ইউনূস সাহেব পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকলে ভারতীয় বীর্য ও চাঁদাবাজরা পদ্মা মেঘনা যমুনা জলে অটোমেটিক ভেসে যাবে, রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে।

মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়ে মোঃ সালিউদ্দিন মিয়া লিখেছেন, লোকটা এখন কাজের মন্তব্য বাদ দিয়ে অকাজ নিয়ে বেশি মন্তব্য করেন। আওয়ামী লীগ নির্বাচন করতে পারবে কি পারবে না সে ওনার মাথা ব্যাথা নয়। তিনি ঐ দলের কিছু না। ভারতকে নিয়ে ওনার মন্তব্য করা থেকে ওনার দূরে থাকা উচিত। মনে হয় বয়স হয়ে গিয়েছে, মস্তিষ্ক দূর্বল। রেস্ট নেওয়া উচিত।

হাবিবুর রহমান শাহী লিখেছেন, ফখরুল ইসলাম কিন্তু ঘুরে ফিরে ঐ ইন্ডিয়াকে খুশি করতেই বিজি। ইন্ডিয়া কিসে খুশি হবে সেটা নিয়ে তারা তজবি জপে সব সময় সব জায়গায়।কোন রাজনৈতিক সংগঠনের বক্তব্যে যদি ভারত এবং আওয়ামী স্বৈরাচার প্রীতি প্রমাণিত হয় তবে এ সকল রাজনৈতিক সংগঠনকে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে সকল ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলা সময়ের দাবি। যারা দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারত প্রীতি দেখাচ্ছে যারা বাংলাদেশের জনগণকে ভারতের গোলাম বানাতে চায় এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চলমান কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রুখে দেয়ার চেষ্টা করছে কোন সন্দেহ নাই। এরা কখনও দেশের মঙ্গল চাইনা। দেশের প্রতি যদি আপনার অকৃত্রিম ভালবাসা থেকে থাকে তবে এটা মাথায় রাখবেন যে দল থেকে দেশ বড়।

রাফিন আল-হাসান লিখেছেন, ডক্টর ইউনূস ভাবছেন তিস্তার পানি কীভাবে কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেওয়া যায়। বঙ্গোপ'সাগর কীভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। গভীর সমুদ্র'বন্দর কত দ্রুত চালু করা যায়। কিভাবে রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে ফেরত পাঠানো যায়! আর আমরা ভাবছি, কত তাড়াতাড়ি ডক্টর ইউনূসকে বিদায় করে গোলামীর জিন্দেগীতে ফিরে যাওয়া যায়।হায় আফসোস!

 

banner close
banner close